রবিবার ১৭ অক্টোবর ২০২১ || কার্তিক ১ ১৪২৮ || ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

Logo
Logo

বরিশালে হু হু করে বাড়ছে করোনা সংক্রমণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

আপডেট: 11:05 PM, সোমবার, ১২ এপ্রিল, ২০২১

১১

বরিশালে হু হু করে বাড়ছে করোনা সংক্রমণ

গত ৯ এপ্রিল বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন নগরীর নিউ সার্কুলার রোডের বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন (৮২)। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তিনদিন করোনা ইউনিটে চিকিৎসাধীন থেকে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

দেলোয়ার হোসেনের ছেলে দিপু জানান, বাবার মৃত্যুর পর নিজেদের সচেতনতায় বাইরে যাওয়া আসা কম করছেন। তাছাড়া পরিবারের কেউ করোনা আক্রান্ত নেই। তবে প্রশাসন থেকে কোনো যোগাযোগ বা নির্দেশনা তাদের দেওয়া হয়নি।

তারও দুইদিন আগে ৭ এপ্রিল বাবুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মৃত্যুবরণ করেন করোনা আক্রান্ত আব্দুল খালেক। তার ছেলে শাহীন বলেন, উপজেলা প্রশাসন থেকে আমাদের বাড়ি লকডাউনের কোনো নির্দেশনা পাইনি। লকডাউন না দিলেও পরিবারের সবাই আমরা সচেতনতা অবলম্বন করে চলছি।

শুধু এই দুটি পরিবার নয়, মার্চ মাসে বরিশালে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হওয়ার পর থেকে মারা যাওয়া কারও বাড়ি লকডাউন করেনি স্থানীয় প্রশাসন। তাছাড়া বরিশাল জেলায় মোট আক্রান্তের ৯৪ দশমিক ৩ শতাংশ রোগী বাড়িতে অবস্থান করলেও লকডাউনের আওতায় আনা হচ্ছে না। ফলে হু হু করে বাড়ছে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আক্রান্ত রোগী বা মারা যাওয়া রোগীর স্বজনরা কোনো ধরনের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেন না। অনেকেই নিকটস্থ বাজারে নিয়ম করে চা খেতে যান। বন্ধু-স্বজনদের সঙ্গে আড্ডা দেন। স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করে নিত্যদিনের বাজারও করেন। করোনা শনাক্ত হওয়া রোগীরাও এমনভাবে চলাচল করেন। এতে করে অন্যরা সংক্রমিত হচ্ছে। এ অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আইন প্রয়োগ ছাড়া করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

সচেতন মহলের দাবি, হঠাৎ করে বরিশালে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ আক্রান্ত বা মৃত ব্যক্তির বাড়ি লকডাউন না করা। অথচ করোনা সংক্রমণের প্রথম ধাপে সরকারের এই নির্দেশনা কঠোরভাবে পালন করা হতো। হঠাৎ করে কেন করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর প্রতি উদাসীনতা দেখানো হচ্ছে তার সুস্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই কারও কাছে।

বিভাগীয় স্বাস্থ্য দফতরের তথ্য বলছে, ২০২০ সালের ৯ মার্চ বরিশালে প্রথম রোগী শনাক্তের পর থেকে ২০২১ সালের ১১ এপ্রিল পর্যন্ত ১২ হাজার ৫১৫ জন করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ২২৩ জন মৃত্যুবরণ করেছেন।

শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিট সূত্রে জানা গেছে, করোনার প্রথম ঢেউয়ে ভর্তি হওয়া সর্বশেষ রোগী ছিলেন মঠবাড়িয়ার বাসিন্দা এক নারী। তিনি ২০২১ সালের ২৯ জানুয়ারি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন। এরপর থেকে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে কোনো রোগী ভর্তি ছিল না। কিন্ত এই বছরের ৭ মার্চ করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে সংক্রমিত হয়ে প্রথম রোগী ভর্তি হন। বর্তমানে এখানে দেড় শতাধিক রোগী ভর্তি রয়েছেন।

জানা গেছে, বরিশাল জেলায় বিগত ১১ দিনের মধ্যে সাতদিনই সংক্রমণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ১ এপ্রিল ২৯ জন, ২ এপ্রিল ২৪ জন, ৩ এপ্রিল ৩২ জন, ৪ এপ্রিল ৩৪ জন, ৫ এপ্রিল ৪৮ জন, ৬ এপ্রিল ৬৪ জন, ৭ এপ্রিল ১০৭ জন, ৮ এপ্রিল ১৪ জন, ৯ এপ্রিল ৬৯ জন, ১০ এপ্রিল ৮৯ জন এবং ১১ এপ্রিল ৩১ জনের দেহে করোনা শনাক্ত হয়েছে। এই ১১ দিনে করোনা শনাক্ত হওয়া ৫৪১ জনের মধ্যে মাত্র ২৭ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বাকি ৫১৪ জন বাড়িতে থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন।

তবে জেলার ১০টি উপজেলায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বিগত ১১ দিনে একটি বাড়িও লকডাউন করা হয়নি।

এ বিষয়ে বরিশালের সিভিল সার্জন ডা. মনোয়ার হোসেন জানান, সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক করোনা আক্রান্ত বা মৃত ব্যক্তির বাড়ি লকডাউন করার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দেওয়া আছে। সেটি কার্যকর করবে জেলা প্রশাসন। এ বিষয়ে তিনি জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলার অনুরোধ জানান।

সিভিল সার্জন বলেন, করোনা আক্রান্ত বা মৃত ব্যক্তির বাড়ি লকডাউন করা না হলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়বে এটিই স্বাভাবিক। কারণ তাদের স্বজনরা সবার সঙ্গে ওঠাবসা করলে তাদের মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়াবে।

বরিশালের পুলিশ সুপার মারুফ হোসেন বলেন, লকডাউন কার্যকর করে জেলা প্রশাসন। তাই এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।

বরিশাল মেট্রোপলিটন এলাকায়ও কোনো বাড়ি লকডাউন হওয়ার খবর জানা যায়নি। বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মো. শাহাবুদ্দিন খান বলেন, আক্রান্ত কিংবা মারা যাওয়া ব্যক্তির স্বজনরা সচেতন হলে সংক্রমণ কমবে। করোনা আক্রান্ত বা করোনায় মারা যাওয়া ব্যক্তির বাড়ি লকডাউন করা হলে ওই পরিবারটি অসহায় হয়ে যায়। সেই পরিবারের জন্য অনেক লজিস্টিক সার্পোট দরকার। এজন্য আমরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাচল করতে উৎসাহিত করছি।

বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মো. ফারুক জানান, গত বছর করোনা প্রতিরোধে সিটি করপোরেশনের যে ভূমিকা ছিল এ বছরও তার কমতি থাকবে না।

লকডাউন প্রশ্নে তিনি বলেন, চলমান লকডাউনে সারাদেশের চিত্র প্রায় একই। আগামী ১৪ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী লকডাউন শুরু হবে, তাতেই সংক্রমণ কমে আসবে।

এ বিষয়ে বিভাগীয় স্বাস্থ্য দফতরের পরিচালক ডা. বাসুদেব কুমার দাস বলেন, আক্রান্তদের তথ্য আমরা জানিয়ে থাকি। কিন্তু লকডাউন করার এখতিয়ার আমাদের নেই। এজন্য স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে।

বরিশালের জেলা প্রশাসক জসীম উদ্দিন হায়দার বলেন, গত বছরতো একটি ভয় ছিল সবার ভেতরে। অপনাদের হয়তো মনে আছে, করোনার মারা যাওয়া ব্যক্তির মরদেহ এলাকায় ঢুকতে দিত না এমন ঘটনাও ঘটেছিল দেশে। বাস্তবতা হলো যে পরিবারটিকে লকডাউন করা হয় সেই পরিবারটি আসলে সম্পূর্ণরূপে অসহায় হয়ে পড়ে। এজন্য স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার নির্দেশনা রয়েছে।

জেলা প্রশাসক বলেন, শুধু আমার বলে দিলেই হবে না। সিভিল সার্জন, পুলিশ প্রশাসন সবার সহায়তায় তা নিশ্চিত করতে হবে। এখানে সকলের দায়িত্ব রয়েছে। করোনায় মারা যাওয়া বা আক্রান্ত ব্যক্তির তথ্য আমাকে দিলে আমি ওই বাড়িটি লকডাউনের ব্যবস্থা করবো।

ফেসবুকে অমাদের ফলো করুন