বুধবার ২০ অক্টোবর ২০২১ || কার্তিক ৫ ১৪২৮ || ১৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

Logo
Logo

কারা মামুনুলের অনুসারী?

নিজস্ব প্রতিবেদক

আপডেট: 12:08 PM, রবিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২১

১১

কারা মামুনুলের অনুসারী?

হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব ও খেলাফত মজলিসের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মাওলানা মুহাম্মাদ মামুনুল হক আলোচিত-সমালোচিত এক বক্তা। সারাদেশে তার সমর্থকের সংখ্যা অগণন। গত ক’বছরে তার বিশাল একটা ভক্তশ্রেণি গড়ে ওঠেছে। ভক্তদের সকলেই যে খেলাফত মজলিশ ও হেফাজতে ইসলামের সমর্থক তা না; এই সংগঠনগুলোর বাইরেও আছে তার ভক্ত-সমর্থক। সাম্প্রতিক রিসোর্টকাণ্ডের আগে ওইপর্যায়ের জনগোষ্ঠীর কাছে তার জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী। এই সময়ে ধর্মীয় বক্তাদের মধ্যে তিনি জনপ্রিয়তায় ছিলেন অনেক উচ্চস্থানে। কেবল ভক্ত-সমর্থক পর্যায়েই না, আলেমওলামা পর্যায়েও তার অসংখ্য অনুরাগী রয়েছে। ভক্তদের মত তারাও তাকে অনুসরণ করে, মান্য করে, তার নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। কেলেঙ্কারির পরও শুরুতেই তাই তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি হেফাজত। এর মূল কারণ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তার ব্যাপক প্রভাব।

ধর্মীয় সমাবেশে, ওয়াজ মাহফিলে তার দেওয়া বক্তৃতাগুলো আলোচিত হয়, সমালোচিত হয়, ভক্তরা আলোড়িতও হয়। অল্প কিছুদিনের মধ্যে দেশের আলেমসমাজের নেতৃত্বের পর্যায়ে চলে গিয়েছিলেন মামুনুল। তার ভাই মাওলানা মাহফুজুল হক বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের (বেফাক) মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি খেলাফতে মজলিশের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের পদে অধিষ্ঠিত হন। দেশের বিশ হাজারের অধিক কওমি মাদ্রাসার অভিভাবক প্রতিষ্ঠান বেফাকের মহাসচিবের পদে নিজের বড়ভাইকে অধিষ্ঠানের পেছনেও মুখ্য ভূমিকা পালন করেন এই মামুনুল হক। কওমি শিক্ষাবোর্ডের দ্বিতীয়-প্রধান ব্যক্তি হয়ে যাওয়ার পর মাহফুজুল হকের দলীয় পদ ছাড়ার বাধ্যবাধকতা থাকায় খেলাফতে মজলিশের মহাসচিবের পদে তার চলে আসাটাই ছিল স্বাভাবিক, এটা তিনি আদায় করে নিয়েছেন।

এরআগে হাটহাজারি মাদ্রাসায় যে ছাত্রবিদ্রোহ হয় সেখানেও কলকাঠি নাড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে সবকিছু তিনি সামলে নিয়েছিলেন। হাটহাজারি মাদ্রাসার মহাপরিচালকের পদ ছাড়তে বাধ্য হওয়ার পরের দিন মাওলানা শাহ আহমদ শফী মারা যান। এখানে আহমদ শফীর মৃত্যুতে তার দায় নিয়ে হেফাজতের একাংশ অভিযোগ করলেও তার বিরুদ্ধে আইনি ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি। শফীর মৃত্যুর পর হেফাজতের আমির হন মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী ও শুরুতে মহাসচিব হন মাওলানা নূর হোসেইন কাসেমি, মামুনুল হক হন যুগ্ম মহাসচিব। নূর হোসেইন কাসেমি মারা যাওয়ার পর জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হন হেফাজতের সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা নূরুল ইসলাম জিহাদি। এই জিহাদিও মামুনুল হক বলয়ের লোক; বলা যায় পুরো কমিটিই মামুনুল বলয়ের লোক।

হেফাজতে ইসলামের বর্তমান যে কমিটি সেখানে আহমদ শফী বলয়ের কেউ নেই। শফীর অনুসারীরা এই কমিটিকে প্রত্যাখ্যান করলেও ঘোষণা অনুযায়ী পাল্টা কমিটি দেয়নি। কমিটির করতে না পারার কারণ মূলত বাবুনগরী-মামুনুল বলয়ের নেতাদের সাংগঠনিক ভিত্তি যেখানে প্রতিযোগিতায় পেরে ওঠতে পারেননি শফীর বলয়ের লোকজনেরা। এখানে যতটা না শফীপুত্র আনাস মাদানির সাংগঠনিক অদক্ষতা তার চাইতে বেশি রয়েছে মামুনুল হকদের সাংগঠনিক দক্ষতা।

কথাগুলোর বলার কারণ মূলত নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের রয়্যাল রিসোর্ট কেলেঙ্কারির পর এই নিবন্ধ লেখা পর্যন্ত হেফাজতে ইসলাম নামের সংগঠনে মামুনুল হকের টিকে থাকার কারণ অনুসন্ধান। হেফাজত এখন পর্যন্ত তাকে ওন করছে।পুরো সংগঠনে তার বলয়ের নেতাদের উপস্থিতি ও সমর্থনের কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে। নিজের বন্ধুর সংসার ভেঙে বন্ধুস্ত্রীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন সত্ত্বেও খেয়ালখুশিমত ব্যাখ্যা উপস্থাপন করে মামুনুলের পক্ষ নিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। এটা যতটা না ধর্মের ব্যাখ্যা, তারচেয়ে বেশি মামুনুল হকের প্রভাব। এই প্রভাব এতখানি যে ধর্মের বাণী, ধর্মের ব্যাখ্যাও বদলে গেছে। ধারণা করি এখানে মামুনুল হক ছাড়া অন্য কেউ হলে হেফাজত ঠিকই অন্য ব্যাখ্যা দিতো!

কেবলই নিজেদের সংগঠনে একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী মামুনুল হক এটা না, তার প্রভাব রয়েছে অনুভূতিপ্রবণ কথিত তৌহিদি জনতা ও সরকারবিরোধী সকল মহলের মাঝেও। আওয়ামী লীগ, সরকারকে অপছন্দ করে এমন বেশিরভাগ ব্যক্তি ও সংগঠনের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। এই গ্রহণযোগ্যতা মামুনুলের আদর্শের প্রতি নয়, এটা মামুনুলের সরকারবিরোধী অবস্থানে উচ্চকণ্ঠ থাকার কারণেই। ফলে মামুনুল যখন হুঙ্কার ছুঁড়েন তখন সরকারবিরোধী সকল মহল আশায় বুক বাঁধে এই বুঝি সরকারের পতন হয়ে গেল। নিজেদের সাংগঠনিক দুর্বলতা অনেকেই আড়াল করতে চায় মামুনুলদের সঙ্গ দিয়ে। এটা আদর্শহীন রাজনীতির চর্চা হলেও বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন সেটা করেই যাচ্ছে।

বাংলাদেশে ধর্মের নামে রাজনৈতিক চর্চা হয়ে আসছে। কেবল ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোই নয় ধর্মীয় আদর্শে পরিচালিত নয় এমন রাজনৈতিক দলের অনেক নেতার মাথায় নির্বাচনের আগে টুপি ও হেজাব ওঠে যায়। এরবাইরে সারাবছরই ওয়াজ মাহফিলে ধর্মীয় বক্তারা যেসকল বার্তা প্রচার করে আসছেন সেটা কোনোভাবেই ধর্মের সঠিক চর্চা নয়; বরং সেটা ধর্মীয় বিদ্বেষ প্রচার। এমন অবস্থায় কথিত ধর্মীয় অনুভূতিপ্রবণ এক শ্রেণির তৌহিদি জনতার উপস্থিতি সবসময়ই লক্ষ্য করা যায়। হেফাজত নেতা মামুনুল হক অনুভূতিপ্রবণ এই তৌহিদি জনতার কাছে জনপ্রিয় এক বক্তা। তার জনপ্রিয়তার কারণ কণ্ঠের মাধুর্য কিংবা ধর্মীয় জ্ঞান নয়। তার জনপ্রিয়তার কারণ উসকানিমূলক বার্তা প্রচার, এবং সেইসব বার্তায় উদ্দিষ্ট শ্রোতাকে মোহময়তায় না ভাসালেও জেহাদি জোশে জাগরূক করতে পারেন তিনি।

কথিত এই তৌহিদি জনতা মামুনুলদের উসকানিমূলক বার্তায় উত্তেজিত হয়। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ বুকে নিয়ে চিন্তাজগত নির্ধারণ করে, অনেকে ওইপথে চালিত হয়। তারা নিজেদের ধর্মের লোকজনেরও মধ্যকার সগোত্রীয়দেরই কেবল ইমানদার মনে করে; অন্যরা তাদের দৃষ্টিতে ইমানহীন। তারা হিন্দুদের মনে করে ধর্মহীন, একইভাবে অন্যধর্মীয়দেরও। তাদের কাছে মূর্তি ভাঙা, মন্দির ভাঙা পুণ্যের কাজ। তারা নাস্তিকদের কতল ধর্মের অনুশাসন বলে বিশ্বাস করে। ব্যক্তিপর্যায়ে তাদের বেশিরভাগই কতলকার্যে জড়িত না থাকলেও পরোক্ষভাবে এর আগাগোড়া সমর্থক। ধর্ম তাদের কাছে বর্ম। মামুনুলদের মত কথিত ধর্মপ্রচারক তাদের কাছে ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে। সরকারবিরোধিতা, রাষ্ট্রবিরোধিতা, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, নারী বিদ্বেষসহ উসকানিমূলক নানা বার্তা ধারাবাহিকভাবে প্রচার করার কারণে এই সময়ে মামুনুল হক জনপ্রিয় তাদের কাছে। তারা তাকে ত্রাতা ভাবতেও শুরু করেছে। তাই নারায়ণগঞ্জের রিসোর্টে নারীঘটিত কেলেঙ্কারি সত্ত্বেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কথিত এই তৌহিদি জনতা তার পক্ষে দাঁড়িয়ে গেছে। মামুনুল হক কোনো অপকর্ম করতেই পারেন না, এমন বিশ্বাসে উজ্জীবিত তারা একের পর এক অস্বীকার করে গেছে। এই অস্বীকার তত্ত্ব জপে তারা নানা যুক্তি উপস্থাপন করেছে, খিস্তিখেউড় ছুঁড়েছে। তবু শেষ রক্ষা হয়নি, সত্য দিবালোকের মত স্পষ্ট হয়ে গেছে। মামুনুল হক তার নারী কেলেঙ্কারি ঢাকতে যে ফোনকল করেছিলেন ফাঁস হওয়া ওই কলগুলো তার ছিল বলেও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। তার কথিত দ্বিতীয় স্ত্রীর ডায়েরির পাতায়-পাতায় লিপিবদ্ধ থাকা প্রতারণার গল্পগুলো তার অসততার প্রমাণ দিলেও একশ্রেণির লোক ঠিকই এখনও তার পক্ষে থেকে গেছে।

কেবলই কি এই তৌহিদি জনতা মামুনুলের ভক্ত? না, এর বাইরে আরেকদল আছে যারা সামাজিক শৃঙ্খলাবিনাশী উসকানিতেও শামিল হয় সময়ে-সময়ে। রাষ্ট্রবিরোধী অবস্থানে তৌহিদি জনতার অংশগ্রহণে এরা ভাবে এই বুঝি রাষ্ট্রক্ষমতায় পরিবর্তন এসে গেল। সরকারের পরিবর্তন হবে এই চিন্তায় তারাও শামিল হয় মিছিলে-স্লোগানে, জড়ায় সহিংসতায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় তোলে। এরা মামুনুলের আদর্শিক অনুসারী না হলেও মামুনুলদের শক্তিতে ভরসা তাদের। এই দলে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদের সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরসহ আরও অনেকেই। মামুনুলের পক্ষে কথিত তৌহিদি জনতা সাড়া দেওয়ায় এরাও অন্য সকলের মত সরকারপতনের স্বপ্ন দেখে থাকে। এসব ক্ষেত্রে বিএনপি প্রকাশ্য দলীয় সিদ্ধান্তে মামুনুলের পক্ষে না দাঁড়ালেও সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা দলটিরসহ সরকারবিরোধী সকল দলের নেতাকর্মীরাও মামুনুলের পক্ষে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে দাঁড়িয়ে যায়।

মামুনুল হকের পূর্বতন জনপ্রিয়তার কারণ তার অনুসারী পর্যায়ের লোকদের অজ্ঞতা, বিদ্বেষের সহজাত চাষ, উসকানির সঙ্গে আরও আছে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা। প্রকাশ্য রাজনীতির সুযোগহীনতায় রাজনীতির অনেকে মামুনুলদের প্রতিক্রিয়াশীল অপরাজনীতিকে ভরসা করেছে। তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যগুলো গত কিছুদিন ধরে প্রকাশ্য হয়ে যাওয়ার পর কিছু লোক হয়ত বিভ্রান্ত হয়েছে, তবে বিশাল একটা জনগোষ্ঠীর ওপর এর প্রভাব পড়বে কি না এটা নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। ধর্ম ও ধর্মীয় নেতায় যারা মন্ত্রমুগ্ধতায় আচ্ছন্ন তাদেরকে মনোজগৎ অনুধাবন কষ্টকর বৈকি!

ফেসবুকে অমাদের ফলো করুন